যেই মুহুর্তে আপনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আরাম করে আমাদের কন্টেন্টটি দেখেছেন, সেই মুহুর্তে হয়ত আপনার কাছের কোন বান্ধবী আপনার অজান্তেই বারে নানারকম সঙ্গী নিয়ে মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে হয়তো তারা শুরু করেছিল মজা কিংবা কৌতুহল বা কোনো হতাশা ভুলে থাকার জন্য, কিন্তু এখন এটি একটি নীরব আসক্তিতে রূপ নিয়েছে।

আসক্তি শব্দটি আমাদের সবার কাছেই পরিচিত। শব্দটি শুনলে সাধারণত একজন পুরুষের চিত্র মনে আসতে পারে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নারীদের মধ্যেও আসক্তির প্রবণতা লক্ষণীয়, যা সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে শহর, গ্রাম, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সবখানেই মাদকের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে।  সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।২০২০ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) একটি গবেষনা পরিচালনা করে, যেখানে দেখা যায় যে বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের মাঝে পুরুষের (৪৭.২%) চেয়ে নারী (৫২.৮%) মাদকাসক্তের হার বেশি। Department of Narcotic Control (DNC) এর গবেষনা থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সমাজের সকল শ্রেণির নারীরাই মাদকে আসক্ত হয়ে যেতে পারে, তবে সবচেয়ে বেশি আসক্ত উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীরা।  উচ্চশিক্ষিত ও সম্পদশালী পরিবারের মাদকাসক্ত নারীদের তথ্য প্রকাশিত হলেও দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারের মাদকাসক্ত নারীদের তথ্য প্রায়ই অপ্রকাশিত রয়ে যায়। এর ফলে অধিকাংশ নারীই যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত এর মধ্যে ১৬ শতাংশই নারী। উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরা চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীদের ক্ষেত্রে এটি অনেকটাই অনুপস্থিত। 

মানস জানায় যে নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে ৩২%সিগারেট পান করে, প্রায় ২৮% এলকোহল গ্রহণ করে, ৩৩% ঘুমের ঔষধ গ্রহণ করে এবং ২৬% গাঁজা সেবন করে, ৫% হেরোইন এবং ৫% ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে

ঢাকা আহছানিয়া মিশন (ডি এ এম) এর তথ্য। অনুযায়ী ১৫ থেকে ৩৫ বছরের যে মাদকাসক্ত নারীরা, তার ৫৬% ই ইয়াবা সেবন করে।

সম্প্রতি যুগান্তরের একটি রিপোর্টে প্রকাশিত “মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর”(নারকোটিস্ক) এর অনুসন্ধান মতে যে তথ্য পাওয়া গেছে – বর্তমানে উঠতি বয়সীদের যে  ক্রাশ – অভিনেত্রী সাফা কবির, তানজিন তিশা , মুমতাহিনা চৌধুরী টয়া এবং সঙ্গীত শিল্পী সুনিধি নায়েক – তারা ভয়াবহ মাদকাসক্ত।  নিয়মিত মাদক গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন পার্টিতে মাদক নিয়ে যান। তারা যেসব মাদক গ্রহণ করে- এম ডি এম এ, এল এস ডি, কুশ, টি এস সি।

নারীদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ:

  • মাদক একটি নীরব ঘাতক, যা ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। 
  • আমাদের দেশের আর্থ – সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি মানসিক আঘাত, মানসিক চাপ , সামাজিক বৈষম্যের শিকার তাই ৭৫% নারী মাদকাসক্তের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার কারণ এই মানসিক চাপ ও যৌণ হয়রানি।
  • কিছু কিছু বয়ঃসন্ধিতে বন্ধু – বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে কৌতুহল বশত মাদক টেস্ট করতে গিয়ে নেশার নীল দুনিয়ায় হারিয়ে যায়। একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৭% নারী আবাসিক শিক্ষার্থী মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারে সাথে জড়িত। প্রচলিত মাদকদ্রব্যগুলোর মধ্যে গাঁজা এবং ফেনসিডিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত (৪৪% করে), এবং সেডেটিভ বা ঘুমের ওষুধ দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত (৩২%)। অধিকাংশ শিক্ষার্থী (৮৭%) বন্ধু-বান্ধব এবং পরিচিতজনদের মাধ্যমে এই মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে থাকে।
  • বেশিরভাগ কাছের সম্পর্কগুলো, যেমন – বন্ধু – বান্ধব, পরিবাররা প্রেমময় সম্পর্ক থেকে প্রতারিত হয়ে, কষ্ট পেয়ে নারীরা সেটা ভুলে থাকতে আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে।
  • সম্পর্কের প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে না পেরে একাকীত্ব ঘুচাতে ও আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে।
  • নানা রকম পারিবারিক অশান্তি, পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরত্ব, একাকীত্ব ভুলে থাকার জন্যও মাদকাসক্তির হার বাড়ছে দিন দিন । 
  • অনেক সময় নারীদের প্রতি এত বেশি অতিরিক্ত সামাজিক দায়িত্ব, পেরেশানি বা চাপ দেওয়া হয়, এটা অনেকেই সহ্য করতে না পেরে  তীব্র হতাশা থেকেও মাদক গ্রহণ শুরু করে দেয়।
  • আবার অনেক সময় এসব চাপে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, বা “ট্রেন্ড” অনুসরণের মানসিকতা নারীদের মাদকাসক্তির সম্ভবনা বাড়ায়।
  • জীবনের কোনো বড় মানসিক আঘাত, যেমন – পরিবারের কাছের করব সঙ্গীদের মৃত্যু, তালাক, কেনো দুর্ঘটনা – এসবের চাপ নিতে না পেরে ও অনেকে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে।
  • এমনকি আসক্তির পরেও নানারকম সামাজিক চাপ, সামাজিক ভীতি ও লোকলজ্জার ভয়েও নারী মাদকাসক্তরা চিকিৎসা নিতে বা সুস্থতার দিকে যেতে রাজি হয় না।
  • ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের একটি গবেষণায় এসেছে, দম্পতি কলহের কারণেই অনেক নারী মাদকাসক্ত হচ্ছেন।
  • পুরুষদের তুলনায় নারীরা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সমস্যায় বেশি ভোগেন এবং প্রায়ই তাদের ব্যথা উপশমের জন্য ওপিওয়েড (opioid) বা অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয়। এই ওষুধগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার, নির্ভরতা এবং পরবর্তীতে আসক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এ ছাড়াও, শারীরিক বা মানসিক কষ্ট, ব্যথা, বেদনা প্রশমনের জন্য মাদকের ব্যবহার, বিশেষ করে ওষুধের অপব্যবহার, নারীদের মধ্যে দেখা যায়। সহজলভ্য মাদক নিষ্কৃতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাবও নারীদের আসক্তি । বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এই সমস্যার সমাধানে নারীদের জন্য বিশেষ মানসিক সহায়তা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

মাদকাসক্তের প্রভাব:

নারীদের জীবনে মাদকের আসক্তি বহুমাত্রিক ও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।এই প্রভাব শুধু বর্তমান সময়ে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী জীবনযাত্রাকে জটিল করে তোলে। নিচে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানসিক, শারীরিক, এবং আচরণগত প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবঃ

  • হরমোন ও প্রজনন সমস্যা- যেমনঃ ফিটাল আলকোহল সিন্ড্রোম বা নবজাতকের প্রত্যাহার সমস্যা, দ্রুত মেনোপ
  • গর্ভাবস্থায় সমস্যা

-সময়ের আগেই অপরিণত বাচ্চা ডেলিভারী

-অপুষ্ট বাচ্চা ডেলিভারী

-গর্ভপাত

-মৃত বাচ্চা ডেলিভারী

-জন্মগত ও স্নায়ুগত ত্রুটি নিয়ে বাচ্চা ডেলিভারী

  • নানারকম যৌনবাহিত রোগের সংক্রমন
  • রোগ সংক্রমনের ঝুকি
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে
  • স্নায়ুবিক ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি

-স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া, খিচুনী

-দীর্ঘমেয়াদী মাদকে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্ষতি যেমন লিভার, হার্ট্ম কিডনী, ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

  • মাদকের সরাসরি প্রভাব-

-এলকোহলঃ লিভার সিরোসিস ও ব্রেস্ট ক্যান্সার এর কারন

-টোবাকো এবং ই-সিগারেটঃ বিভিন্ন রকম হার্টের সমস্যা, লাংস ক্যান্সার

আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা:

মাদক নারীদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তারা প্রায়ই হঠাৎ রাগ বা দুঃখে অভিভূত হন। মানসিক স্থিতিশীলতার অভাবে তারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, যা ব্যক্তিগত এবং কর্মক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে।

বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি:

মাদকাসক্তি বিষণ্ণতার প্রবণতা বাড়ায়, কারণ এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন এবং সেরোটোনিনের স্বাভাবিক মাত্রাকে ব্যাহত করে। বিষণ্ণতা তীব্র হলে নারীরা আত্মহত্যার চিন্তা করতে পারেন বা চেষ্টা করতে পারেন, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

মানসিক স্থিতিশীলতা হ্রাস:

মাদকের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার নারীদের মানসিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তারা উদ্বেগ, অস্থিরতা, এবং মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন। এর ফলে তাদের দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনের ক্ষমতা হ্রাস পায়।

সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব:

মাদকাসক্তির ফলে নারীরা প্রায়ই তাদের পরিবার এবং বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যান। সন্তান, স্বামী বা অন্য পরিবারের সদস্যদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি করে। এর ফলে একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়।

অপরাধবোধ এবং আত্মসম্মানের অভাব:

মাদকাসক্ত নারীরা প্রায়ই অপরাধবোধ এবং লজ্জায় ভোগেন। বিশেষত, যদি তারা মা হন এবং সন্তানের প্রতি তাদের অবহেলার জন্য নিজেকে দায়ী করেন। এই অনুভূতি তাদের আত্মবিশ্বাসকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং পুনর্বাসনের পথ কঠিন করে তোলে।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা:

সমাজে মাদকাসক্ত নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব এবং কলঙ্ক তাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ঠেলে দেয়। তাদের প্রতি অবজ্ঞা এবং অবহেলা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়, যা পুনর্বাসনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।মাদক মস্তিষ্কের স্মৃতি, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

পুনর্বাসনে সমস্যা:

দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহারের কারণে নারীদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে ওঠে। মানসিক স্থিতি পুনরুদ্ধার করতে সময় এবং নিরবচ্ছিন্ন মানসিক সহায়তা প্রয়োজন হয়।

পারিবারিক ও সামাজিক জীবন: 

মাদকাসক্ত নারীরা প্রায়শই পরিবারে অশান্তি ও টানাপোড়েনের কারণ হন। সন্তানদের প্রতি অবহেলা এবং পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। সামাজিকভাবে তারা চরম অপমান এবং বিচ্ছিন্নতার শিকার হন, যা তাদের পুনর্বাসনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

মাদকাসক্ত নারীরা কিন্তু এ সমাজেরই অংশ। তাই তাদের মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে বের করতে অনেক বেশি সহযোগিতা, যত্ন, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন। 

 

যে কোনো মানসিক সহায়তায় আমরা পাশেই আছি,

অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ফোন করুন –
https://insight.com.bd/appointment/

আমাদের ঠিকানা – “ ইনসাইট সাইকো সোশাল কেয়ার এন্ড রিসার্চ

৭১, পাইওনিয়ার রোড, সেগুনবাগিচা,