আমাদের জীবনে প্রতিনিয়তই নানান নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি, সেটাই অনেকাংশে আমাদের জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কিংবা পড়াশোনা শেষ করে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে পেশাগত জীবন শুরু করার সময় তাদের প্রায়ই মানিয়ে নিতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এসব নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে স্বাভাবিক আচরণ করতে পারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, যা একজন মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। তবে কিছু মানুষ নতুন পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, যার ফলে তাদের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে তারা ব্যর্থতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।/ তাদের সফলতা বাধাগ্রস্ত হয়।

Adjustment Problem বা মানিয়ে নেয়ার সমস্যা:

যে কোন নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে গিয়ে সাধারণত যেসব মানসিক সমস্যাসমূহ দেখা দেয়:-

১. নিজেকে একা একা লাগে (Loneliness)।
নতুন পরিবেশে প্রবেশ করলে পরিচিত মানুষ, নিরাপদ সম্পর্ক ও আগের রুটিন থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। এই পরিবর্তনের ফলে মনে হতে পারে—
“এখানে আমার কেউ নেই”, “আমি একা”।
এটি আসলে Transition phase-এর একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া। নতুন বন্ধু বা সহকর্মীদের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি হতে সময় লাগে। কিন্তু অনেকেই এই সাময়িক একাকীত্বকে নিজের ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে ফেলে, যা দুঃখ, নিরুৎসাহ ও সামাজিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা জরুরী যে,একাকীত্ব মানেই আপনি অযোগ্য নন-এটি মানিয়ে নেওয়ার প্রাকৃতিক অংশ।

২. আত্মবিশ্বাস ওঠানামা করে
নতুন পরিবেশে নিজের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। আগে যেখানে আপনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, সেখানে এখন মনে হতে পারে—
“আমি কি ঠিক পারবো?”
“অন্যরা কি আমার চেয়ে ভালো?”
কারণ এখানে তুলনার সুযোগ বেশি এবং নিজের দক্ষতা যাচাই করার নতুন মানদণ্ড থাকে। ফলে আত্মবিশ্বাস কখনো বাড়ে, কখনো হঠাৎ কমে যায়। এটি মূলত performance anxiety ও self-doubt-এর মিশ্রণ।

৩. মনে হয় সবাই আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছে।
এটাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় Spotlight Effect। আমরা মনে করি—আমাদের কথা, আচরণ, ভুল সবাই খুব খেয়াল করছে।

বাস্তবে কিন্তু মানুষ বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু নতুন পরিবেশে এই ভাবনা বেড়ে যায়, যার ফলে অস্বস্তি,সামাজিক ভয়,
নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
এই অনুভূতি গুলো স্বাভাবিক ভাবে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলে self confedence কমাতে পারে।

৪. অল্পতেই নার্ভাস হয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হয়।
নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা কম থাকে। ফলে শুধু মনে হতে পারে-
কী বলবো?
কী করবো?
ঠিক না ভুল?
এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে। এর ফল হিসেবে nervousness, overthinking ও decision paralysis তৈরি হয়। এটি মূলত Uncertainty intolerance থেকে আসে।

৫. কলেজ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাধারণ চ্যালেঞ্জ-

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ উত্তর জর্ডানে প্রথম বর্ষের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০% শিক্ষার্থীর মধ্যে অ্যাডজাস্টমেন্ট সমস্যার উপস্থিতি ছিল (Aderi et al., 2013)। এশীয় দেশগুলোর অন্যান্য গবেষণায় দেখা যায়—মালয়েশিয়ায় ২৬% (Abdullah et al., 2009) এবং ভারতে ৯% (Devi et al., 2016) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী একাডেমিক অ্যাডজাস্টমেন্ট সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম বর্ষই সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়, কারণ এই সময়ে মানিয়ে নেওয়ার নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়—যেমন, পরিবারের বাইরে থাকার অভিজ্ঞতার অভাব এবং কার্যকর মোকাবিলা কৌশলের ঘাটতি। এসব সমস্যা ব্যক্তিগত, সামাজিক, আধ্যাত্মিক এবং একাডেমিক সাফল্যের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে (Mattanah et al., 2004)।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিম্নলিখিত সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়—একাডেমিক চাপ, আর্থিক সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা, একাকিত্ব, আন্তঃব্যক্তিক দ্বন্দ্ব, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অসুবিধা এবং ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন (personal autonomy) গড়ে তুলতে সমস্যা [2,11]।

Burns (1991), Samuelowicz (1987)–এর গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্প্রসারিত করেন (Kennedy, 1995)। তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রথম বর্ষের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি দলের সঙ্গে প্রথম বর্ষের অস্ট্রেলীয় শিক্ষার্থীদের একটি দলের তুলনা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, বিদেশি শিক্ষার্থীরা সাধারণত আর্থিক সংকট, ইংরেজি ভাষাগত সমস্যা, উচ্চশিক্ষার পড়াশোনার পদ্ধতির চাহিদা, ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা, সহায়তা নেটওয়ার্কের অভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজনজনিত সমস্যার সম্মুখীন হয়।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সম্মুখীন সমস্যাসমূহের সংক্ষিপ্তসার

ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা: ঘরছাড়া অনুভূতি (Homesickness), একাকিত্ব, চাপ, বিষণ্নতা, হতাশা, সামাজিক মর্যাদা বা পরিচয় হারানোর অনুভূতি, উদ্বেগ, বিভ্রান্তি ইত্যাদি।

একাডেমিক সমস্যা: একাডেমিক অগ্রগতি, পড়াশোনার চাপ, আমেরিকান শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব, একাডেমিক সাফল্যের জন্য কার্যকর শেখার দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষা সহায়ক সেবাগুলো (যেমন—লাইব্রেরি, একাডেমিক কাউন্সেলিং সেবা) ব্যবহার করতে অসুবিধা ইত্যাদি।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা: সাংস্কৃতিক ধাক্কা (culture shock), সাংস্কৃতিক ক্লান্তি, স্টেরিওটাইপিং, পক্ষপাত, বর্ণগত বৈষম্য, নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি ও নিয়মকানুনে মানিয়ে নিতে অসুবিধা, আন্তঃসাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে সমস্যা, সম্পর্কজনিত জটিলতা ইত্যাদি।
সাধারণ জীবনযাপন সংক্রান্ত সমস্যা: বাসস্থানের সমস্যা, শিক্ষার্থী সহায়ক সেবা ব্যবহার করতে অসুবিধা, আর্থিক চাপ, খাদ্যসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ইত্যাদি।

ইংরেজি ভাষা দক্ষতা: স্থানীয় ভাষাভাষীদের সঙ্গে যোগাযোগে অসুবিধা, লেকচার বুঝতে সমস্যা, অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রবন্ধ লেখায় জটিলতা ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য সমস্যা গুলো হলো:

★ একাডেমিক চাপ ও নতুন পড়াশোনার ধরন-
কলেজে এসে পড়াশোনার ধরন সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখানে Self-study বেশি,
ক্লাসের বাইরের পড়াশোনা, গুরুত্বপূর্ণ
মূল্যায়ন পদ্ধতি ভিন্ন
ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের আগের মতো মেধাবী মনে করতে পারে না। এতে একাডেমিক স্ট্রেস, পরীক্ষাভীতি ও হতাশা তৈরি হয়।

★ শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে মানিয়ে নেওয়ায় সমস্যা। কলেজে শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে বেশি formal এবং সহপাঠীদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভিন্ন হয়। ফলে
কথা বলতে সংকোচ বোধ হয়,
নিজেকে প্রকাশে ভয় হয়,
ভুল বোঝাবুঝি।
এই সামাজিক সমস্যা গুলো সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের বিষয়।

★স্বাধীনতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য
কলেজ জীবন মানেই স্বাধীনতা-কিন্তু সেই সাথে আসে দায়িত্ব।
হঠাৎ করে সময় ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিজের কাজ নিজে করা-সব মিলিয়ে চাপ তৈরি হয়।
অনেকে স্বাধীনতাকে অতিরিক্ত ভোগ করে ফেলে, আবার কেউ দায়িত্বের ভারে overwhelmed হয়ে পড়ে।

★ আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ ভাবনা।
এই সময়টাকে বলা হয় Identity formation phase।
প্রশ্ন আসে-
আমি কে?
আমার লক্ষ্য কী?
ভবিষ্যতে কী করবো?
এই অনিশ্চয়তা কখনো অনুপ্রেরণা দেয়, আবার কখনো anxiety তৈরি করে।

৬. নতুন চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রে সাধারণ চ্যালেঞ্জ-

★নতুন দায়িত্ব বুঝে ওঠার সমস্যা
নতুন চাকরিতে কাজের বর্ণনা বাস্তবে অনেক জটিল হয়।
Training আর বাস্তব কাজের মাঝে ফারাক থাকে, ফলে
ভুল করার ভয়
নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়া
এটাকে বলা হয় Imposter Syndrome।

★অফিসের নিয়ম ও কালচার
প্রতিটি অফিসের আলাদা-
Communication style
Dress code
কাজের গতি
এই অদৃশ্য নিয়মগুলো না বুঝলে অস্বস্তি তৈরি হয়।

★ সিনিয়র–জুনিয়রদের সাথে আচরণগত কনফিউশন তৈরী হয়।
কাকে কীভাবে কথা বলবো, কতটা informal হবে। এই বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিধা থাকে।
ভুল বোঝাবুঝির ভয় অনেক সময় মানুষকে অতিরিক্ত চুপ করে দেয়।

★পারফরম্যান্স সংক্রান্ত চাপ
নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদে-
Overworking
Burnout
Self-criticism
দেখা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

কগনিটিভ কৌশল (Thinking Skills)

১. বাস্তবধর্মী প্রত্যাশা তৈরি
নিজের কাছে পরিষ্কার রাখতে হবে—
আমি নতুন, শিখছি , ভুল হবেই।
পারফেকশন নয়, প্রগ্রেসই লক্ষ্য।

২. Negative self-talk চিহ্নিত ও পরিবর্তন
যেমন—
“আমি পারবো না” → “আমি শিখছি”
“আমি বোকা” → “আমি অভিজ্ঞতা নিচ্ছি”
চিন্তার ভাষা বদলালে অনুভূতিও বদলে যায়।

৩. শেখার মানসিকতা (Growth Mindset)
ভুল = ব্যর্থতা নয়
ভুল = শেখার সুযোগ
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়।

৪. নিজেকে সময় দেওয়া
মানিয়ে নেওয়া একটি প্রক্রিয়া, ঘটনা নয়।
নিজেকে সময় দিলে আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

Refences

Anbesaw, T., Beyene, A., & Kefale, J. (2022). Adjustment problem and associated factors among first-year undergraduates at Wollo University, Ethiopia. Frontiers in Education, 7. https://doi.org/10.3389/feduc.2022.946417