সন্তান পতিপালন হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সন্তানের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয়, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তীয় ও অন্যান্য বিকাশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। সন্তান প্রতিপালন বলতে কেবল পিতা বা মাতা হওয়াকে বোঝায় না; বরং সন্তানের সঠিক লালন-পালন, যত্ন ও মূল্যবোধের মাধ্যমে তাকে একজন সুস্থ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকেই বোঝায়।
সন্তান প্রতিপালনের পদ্ধতিসমুহ (Parenting Style)
সন্তান প্রতিপালনের প্রধান পদ্ধতিসমূহ সাধারণত চার ভাগে ভাগ করা হয়।
- অথরিটারিয়ান বা কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি (Authoritarian Parenting)
- কর্তৃত্বপূর্ণ বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি (Authoritative Parenting)
- উদাসীন বা অবহেলামূলক পদ্ধতি (Neglectful Parenting)
- উদার বা অবাধ পদ্ধতি (Permissive Parenting)
অথরিটারিয়ান বা কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি (Authoritarian):
অথরিটারিয়ান বা কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি (Authoritarian Parenting) হলো সন্তান প্রতিপালনের এমন একটি পদ্ধতি যেখানে বাবা–মা অত্যন্ত কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এ পদ্ধতিতে সন্তানের মতামত, অনুভূতি ও চাহিদাকে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং বাবা–মায়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। নিয়ম ভাঙলে শাস্তি, ভয় দেখানো বা কড়া আচরণ প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু কেন নিয়ম মানতে হবে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা সাধারণত দেওয়া হয় না। এর ফলে শিশুরা অনেক সময় ভীতু, আত্মবিশ্বাসহীন, সিদ্ধান্তহীন হয়ে ওঠে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশে সমস্যা অনুভব করে।
অথরিটারিয়ান বা কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতির প্রভাব:
অথরিটারিয়ান প্যারেন্টিং শিশুর বিকাশে যেসকল প্রভাব ফেলে তা নিম্নরুপ-
- অথরিটারিয়ান প্যারেন্টিং শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- এর ফলে শিশুতে দেখা দেয় অভ্যন্তরীণ সমস্যা, যেমন- উদ্বেগ ও বিষণ্নতা।
- বাহ্যিক সমস্যা, যেমন- আগ্রাসন এবং আচরণজনিত সমস্যা।
- তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক দক্ষতা কম থাকে।
- শিশুদের কথাবার্তা কম হয় এবং তারা নিজেকে প্রকাশ করতে ও সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা অনুভব করে।
- অথরিটারিয়ান পিতামাতার তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুরা প্রায়ই:
- অসুখী এবং চিন্তাশীল
- অনিরাপদ ও মেজাজী
- লক্ষ্যহীন হয়
- অতিরিক্ত কঠোর এই পদ্ধতি শিশুর স্বাধীনতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত অথরিটারিয়ান প্যারেন্টিং সুপারিশ করেন না, কারণ এটি অথরিটেটিভ প্যারেন্টিংয়ের তুলনায় খারাপ ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত। (Positive Parenting | UNICEF, n.d.)
কর্তৃত্বপূর্ণ বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি (Authoritative Parenting):
কর্তৃত্বপূর্ণ বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি (Authoritative Parenting) হলো সন্তানের প্রতিপালনের এমন একটি ধরণ যেখানে বাবা–মা ভালোবাসা, শৃঙ্খলা ও দিকনির্দেশনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন। এই পদ্ধতিতে স্পষ্ট নিয়ম ও সীমা থাকে, কিন্তু শিশুর মতামত, অনুভূতি ও চাহিদাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাবা–মা শিশুকে শাস্তি দেওয়ার বদলে তার ভুল গুলো বোঝাতে চেষ্টা করেন,করণীয় গুলো ঠিক করে দেন এবং কেন কিছু করা বা না করা উচিত তা ব্যাখ্যা করেন। এই ধরণের প্যারেন্টিং শিশুকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, দায়িত্ব নিতে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফলে তারা পরিপক্ব ও দায়িত্বশীলভাবে বড় হয়।
Baumrind-এর মতে, কর্তৃত্বপূর্ণ (Authoritative) পিতামাতাদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে—
- নিয়ম ভঙ্গ হলে ন্যায়সঙ্গত ও ধারাবাহিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
- সন্তানদের নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া।
- সন্তানদের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহিত করা।
- সন্তানের প্রতি উষ্ণতা, স্নেহ ও যত্ন প্রকাশ করা।
- স্বাধীনতা ও যুক্তিবোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
- সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা।
- সন্তানের আচরণের ওপর সুস্পষ্ট সীমা, পরিণতি ও প্রত্যাশা নির্ধারণ করা।
কর্তৃত্বপূর্ণ (Authoritative) প্যারেন্টিংয়ের প্রভাব:
অতীতে Baumrind-এর গবেষণার প্রভাবে শিশুর বিকাশ বিশেষজ্ঞরা সাধারণত কর্তৃত্বপূর্ণ প্যারেন্টিংকেই সন্তান প্রতিপালনের সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিভিন্ন গবেষণায় বারবার দেখা গেছে যে, কর্তৃত্বপূর্ণ পিতামাতার তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া শিশুরা সাধারণত বেশি সক্ষম, সুখী ও সফল হয়ে ওঠে।
Baumrind-এর মতে, কর্তৃত্বপূর্ণ পিতামাতার সন্তানরা—
- নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়
- ভালো সামাজিক দক্ষতা গড়ে তোলে
- আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মনীতিতে দক্ষ হয়
- সাধারণত আরও আনন্দময় ও ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী হয়
গবেষণায় দেখা গেছে, কর্তৃত্বপূর্ণ প্যারেন্টিং নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর সঙ্গে উন্নতভাবে সম্পর্কিত—
- সৃজনশীলতা
- কিশোর ও তরুণদের জীবনে সন্তুষ্টি
- সমস্যা সমাধানের দক্ষতা
- আত্মমর্যাদা
- আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা
- স্বনির্ভরতা
- সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা
- আত্মবিশ্বাস
যদিও কর্তৃত্বপূর্ণ প্যারেন্টিংকে প্রায়ই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবুও মনে রাখতে হবে যে শিশুর বিকাশের ফলাফলে অন্যান্য নানা বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদাসীন বা অবহেলামূলক পদ্ধতি (Neglectful Parenting):
উদাসীন বা অবহেলামূলক পদ্ধতি (Neglectful Parenting) হলো সন্তান প্রতিপালনের এমন একটি ধরণ যেখানে বাবা–মা সন্তানের চাহিদা, আবেগ ও নিরাপত্তার প্রতি পর্যাপ্ত যত্ন বা মনোযোগ দেন না। এই পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা, দিকনির্দেশনা বা সহানুভূতি প্রায় অনুপস্থিত থাকে, এবং বাবা–মা প্রায়ই সন্তানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ বা সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। এর ফলে শিশু মানসিক, সামাজিক ও আবেগগত বিকাশে পিছিয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যায় পড়ে।
উদাসীন বা অবহেলামূলক পদ্ধতি্র প্রভাব:
- আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
- নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা অবহেলিত মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়।
- উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- আবেগ প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়।
- অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা হয়।
- ভবিষ্যতে দাম্পত্য বা পারিবারিক সম্পর্কে সমস্যা হতে পারে।
- একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ে।
- আগ্রাসী বা বিপরীতভাবে অতিরিক্ত অন্তর্মুখী আচরণ দেখা দিতে পারে।
- নিয়মকানুন মানতে অনীহা।
- ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা (মাদক, অপরাধ ইত্যাদি)।
- আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি।
- পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব।
- শেখার আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা কমে যাওয়া।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানে দুর্বলতা।
- স্কুলে খারাপ ফলাফল বা ঝরে পড়ার ঝুঁকি।
- মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার স্থায়ী ঝুঁকি।
- নিজের সন্তানের প্রতিও একই ধরনের অবহেলা প্রদর্শনের আশঙ্কা।
- পেশাগত জীবনে আত্মবিশ্বাস ও স্থায়িত্বের অভাব।
- জীবনের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
উদার বা অবাধ পদ্ধতি (Permissive Parenting):
উদার বা অবাধ পদ্ধতি (Permissive Parenting) হলো সন্তান প্রতিপালনের এমন একটি ধরণ যেখানে বাবা–মা খুব কম নিয়ম–শৃঙ্খলা আর সীমা আরোপ করেন এবং শিশুকে প্রায় সব বিষয়ে স্বাধীনতা দেন। এই পদ্ধতিতে শাস্তি বা দিকনির্দেশনা খুব কম প্রয়োগ করা হয় এবং শিশুর চাহিদা ও ইচ্ছাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে শিশু প্রায়শই নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে, কিন্তু কখনও কখনও তারা স্ব-নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীলতা এবং সীমা মানার দক্ষতা বিকাশে পিছিয়ে থাকে।
উদার বা অবাধ পদ্ধতির প্রভাবঃ
- আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার অভাব দেখা যায়।
- নিয়ম মানতে অনীহা ও কর্তৃত্ব মেনে নিতে সমস্যা হয়।
- হঠাৎ রাগ, জেদ বা আবেগপ্রবণ আচরণ বৃদ্ধি পায়।
- দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়।
- আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা।
- হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে।
- অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বা আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব গড়ে ওঠে।
- বাস্তব জীবনের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে কষ্ট হয়।
- অন্যের মতামত ও সীমা সম্মান করতে অসুবিধা হয়।
- বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে।
- দলগত কাজে সহযোগিতার অভাব দেখা যায়।
- কর্তৃপক্ষ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে সমস্যা হয়।
- পড়াশোনায় অনিয়ম ও মনোযোগের অভাব।
- নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে না।
- লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনে দুর্বলতা।
- স্কুলের শৃঙ্খলা মানতে অসুবিধা।
- কর্মজীবনে দায়িত্ব ও নিয়মানুবর্তিতার অভাব।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়ানোর সম্ভাব।
- সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাবি বা অসহিষ্ণুতা।
- বাস্তব জীবনের চাপ মোকাবিলায় অক্ষমতা।
ইতিবাচক সন্তান প্রতিপালন (Positive Parenting) কি?
ইতিবাচক সন্তান প্রতিপালন হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে শিশুকে বড় করে তোলা হয় ভালোবাসা, সম্মান ও ধৈর্যের মাধ্যমে, শাস্তি বা ভয় দেখিয়ে নয়। এই পদ্ধতিতে শিশুর আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা হয় এবং ভুল করলে তাকে মারধর বা অপমান না করে সঠিক পথে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। শিশুর অনুভূতি, মতামত ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে তার সঙ্গে খোলামেলা ও সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলাই ইতিবাচক প্রতিপালনের মূল লক্ষ্য। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, সে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং বাবা–মায়ের সঙ্গে বিশ্বাস ও নিরাপত্তার বন্ধন তৈরি হয়, যা তাকে ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। এটি আসলে Authoritative Parenting বা কর্তৃত্বপূর্ণ অভিভাবকত্বের একটি রূপ।
ইতিবাচক অভিভাবকত্বের (Positive Parenting) পাঁচটি উপাদান—
১. নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা (Create a Safe & Interesting Environment):
শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সে স্বাধীনভাবে খেলতে, ভাবতে ও শিখতে পারে। এতে শিশুর কৌতূহল ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
২. ইতিবাচক শেখাকে উৎসাহ দেওয়া (Encourage Positive Learning):
শিশুর শেখার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলা, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ও শেখার ক্ষমতা বাড়ে।
৩. দৃঢ় কিন্তু সহানুভূতিশীল শৃঙ্খলা প্রয়োগ করা (Learn to Use Assertive Discipline):
রাগ বা শাস্তির বদলে শান্ত, স্পষ্ট ও ধারাবাহিক নিয়ম প্রয়োগ করা। এতে শিশু নিয়ম মানতে শেখে এবং দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
৪. বাস্তববাদী হওয়া (Be Realistic):
শিশুর বয়স, সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী প্রত্যাশা নির্ধারণ করা। অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে ধীরে ধীরে উন্নতির সুযোগ দেওয়া।
৫. একজন অভিভাবক হিসেবে নিজের যত্ন নেওয়া (Take Care of Yourself as a Parent):
অভিভাবকের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। সুস্থ ও ইতিবাচক বাবা–মাই শিশুকে ভালোভাবে লালন-পালন করতে পারেন।
ইতিবাচক অভিভাবকত্ব কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় (How to implement Positive Parenting):
ইতিবাচক অভিভাবকত্ব ও ইতিবাচক শৃঙ্খলা (Positive Parenting) একটি সহানুভূতিশীল কিন্তু দৃঢ় পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের ভালো আচরণ শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি এমন একটি অভিভাবকত্বের নীতি, যা ধরে নেয় যে শিশুরা জন্মগতভাবেই ভালো এবং সঠিক কাজ করতে চায়; তবে সঠিকভাবে আচরণ করতে তাদের কিছু দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়। যা পারস্পরিক সম্মান এবং ইতিবাচক অভিভাবক-সন্তান সম্পর্কের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।
এই পদ্ধতিতে অতীতের খারাপ আচরণের জন্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভবিষ্যতে সঠিক আচরণ শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আধুনিক অনেক অভিভাবক তাদের পারিবারিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়ে সুখী সন্তান গড়ে তুলতে এই কোমল অভিভাবকত্ব পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। ইতিবাচক পদ্ধতি তখনই কার্যকর হয়, যখন অভিভাবকরা সন্তানের প্রয়োজন, বিকাশের ধাপ এবং স্বভাব-প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল থাকেন।
ইতিবাচক অভিভাবকত্বের সুফল দেখা যায় অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে সম্মান ও কার্যকর যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দৃঢ় সম্পর্কের মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে সন্তান আপনার সঙ্গে দৃঢ় বন্ধন তৈরি করতে পারে, তাদের আত্মসম্মান ও সুখ বৃদ্ধি পায়, তারা একটি ইতিবাচক আদর্শ পায় এবং খারাপ আচরণ তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
১. স্বাস্থ্যকর আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখানো (Teaching Healthy and Emotional Regulation):
ইতিবাচক অভিভাবকত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো শিশুদের স্বাস্থ্যকর আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ইতিবাচক মোকাবিলা দক্ষতা শেখানো। এই উপকারী কৌশলগুলো শিশুদের শেখানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে তারা নিজেদের আবেগ ভালোভাবে বুঝতে এবং নেতিবাচক পরিণতি এড়িয়ে সঠিকভাবে তা মোকাবিলা করতে শিখবে।
আপনি এই কৌশলটি প্রয়োগ করতে পারেন আপনার শিশুকে জিজ্ঞাসা করে যে,সে কী অনুভব করছে এবং কেন করছে। তাদের আবেগকে স্বীকৃতি দিন এবং বোঝান যে কোনো অনুভূতি হোক, তা আনন্দ, রাগ, দুঃখ-কোন টাই খারাপ নয়। এরপর তারা যখন এমন অনুভব করে তখন কীভাবে সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয় এবং কেন সেইভাবে আচরণ করা গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝিয়ে বলুন। এতে একটি ইতিবাচক মোকাবিলা দক্ষতা গড়ে উঠবে, যা তাদের নিজেদের আবেগ প্রক্রিয়াকরণ করতে এবং পরিস্থিতি সামলাতে উপযুক্ত আচরণ বেছে নিতে সাহায্য করবে।
২. শেখার সুযোগ প্রদান (Providing Opportunities for Learning):
ইতিবাচক অভিভাবকত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুদের নতুন কিছু শেখার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ করে দেওয়া। অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার এই সুযোগগুলো শিশুদের এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে শেখায়, যা কখনও কখনও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
তাদের চেষ্টা করতে, সংগ্রাম করতে এবং পরিশ্রম করে সফল হতে সুযোগ দিলে তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান বৃদ্ধি পায়। তাদের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে দেখা আপনার জন্য কঠিন হতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে তারা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করবে, যা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাদের সহায়তা করবে। এই সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তারা স্কুলে পড়াশোনায় এবং কঠিন আবেগ মোকাবিলায় কাজে লাগাতে পারবে।
শেখার সুযোগ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখুন, তাদের প্রশ্নের উত্তর যেন বয়স উপযোগীভাবে দেন, যাতে তাদের শেখার আগ্রহ এবং বিশ্বকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা আরও বৃদ্ধি পায়।
৩. তাদের পরিশ্রমের প্রশংসা করা (Praising Their Hard work):
ইতিবাচক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের পরিশ্রমের প্রশংসা করা,মূল্যায়ন করা এবং কঠোর সমালোচনা এড়িয়ে চলা। তাদের সাফল্য ও ইতিবাচক আচরণের জন্য পুরস্কৃত করা যেতে পারে, তবে তারা ভুল আচরণ করলে রাগান্বিত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়। সঠিক কাজ শেখার চেষ্টা করার সময় যদি তারা তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়, তাহলে তা অভিভাবক-সন্তান সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
তাদের ভালো আচরণকে যথাযথভাবে উৎসাহিত ও শক্তিশালী করলে ভবিষ্যতেও তারা সঠিক কাজ করতে আগ্রহী হবে। পাশাপাশি, এটি আপনার ও আপনার সন্তানের মধ্যকার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
৪. ভালো আদর্শ হওয়া (Being a good role model):
আপনার সন্তানরা আপনাকে অনুসরণ করে এবং আপনাকেই আদর্শ হিসেবে দেখে। তাই পৃথিবী সম্পর্কে তারা যা শিখছে, তাতে আপনার আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কীভাবে আচরণ করতে হবে, তা অনেকটাই শেখে আপনাকে দেখে। একজন ভালো আদর্শ হলে আপনি তাদের সঠিকভাবে আচরণ করতে শেখাতে পারবেন এবং কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়, তা বুঝতে সাহায্য করবেন। আপনার সন্তানদের সঙ্গে বাস্তব ও খোলামেলা থাকুন। নিজের সংগ্রামগুলো লুকানোর বা সবকিছু ঠিক আছে এমন ভান করার প্রয়োজন নেই। তাদের দেখান যে জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো স্বাভাবিক, গ্রহণযোগ্য এবং প্রচেষ্টা করলে তা অতিক্রম করা সম্ভব।
৫. তাদের ভয়ের মুখোমুখি হতে সাহায্য করা (Helping them face their fears):
ভয় আমাদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। অনেক সময় ভয় মানুষকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা থেকে দূরে রাখে, যা তাদের জন্য ভালো হতে পারত। সন্তুষ্টির অবস্থায় পৌঁছানো ভালো, তবে তাদের ভয়ের মুখোমুখি হতে শেখানো তাদের নিজেদের চ্যালেঞ্জ করতে এবং আরও উন্নত হতে সহায়তা করে।
তাদের ভয়কে স্বীকৃতি দিন এবং বোঝান যে, উদ্বেগ বা ভয় অনুভব করা স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য। তাদের ভয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন (যদিও তা আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে) এবং ধাপে ধাপে সেই ভয়ের মোকাবিলা করার একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন। এতে তারা শিখবে যে ভয় জয় করা ইতিবাচক একটি বিষয় হতে পারে এবং ভবিষ্যতে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হবে, কারণ তারা আগে একবার তা সফলভাবে অতিক্রম করেছে।
৬. আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো (Teaching impulse control):
হঠাৎ কোনো কিছু করতে ইচ্ছে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সব ইচ্ছা পূরণ করা ঠিক নয়। শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো এবং একটু অপেক্ষা করে ভালো ফল পাওয়ার অভ্যাস (delayed gratification) গড়ে তুলতে শেখালে তারা আকর্ষণ সামলাতে পারবে। মন চাইলে ছেড়ে না দিয়ে তারা চেষ্টা চালিয়ে যেতে শিখবে। এতে তারা বুঝবে যে তারা কঠিন কাজও করতে পারে। এতে তারা সবসময় আরও ভালো করার চেষ্টা করতে উৎসাহিত হবে এবং বুঝতে পারবে যে তারা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এই শিক্ষা দিলে তা জীবনের জন্য একটি অভ্যাসে পরিণত হবে। তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে শিখবে এবং এই অভ্যাস জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে,যেমন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাতে পারবে।
৭. ভুল করার স্বাধীনতা দেওয়া(Letting them make mistakes):
ইতিবাচক অভিভাবকত্বে শিশুদের ভালো আচরণকে উৎসাহ দেওয়া হয় এবং ভুল করলে কঠোর সমালোচনা করা হয় না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাদের ভুল করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কখনও কখনও তাদের ভুল করতে দেওয়া কঠিন মনে হতে পারে, কারণ এতে তারা মানসিক বা শারীরিকভাবে কষ্ট পেতে পারে। তবুও, ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিশুদের শেখায় যে ভুল করা স্বাভাবিক এবং ঠিক আছে, যতক্ষণ তারা তাদের ভুল থেকে শেখে এবং যদি কারো ক্ষতি করে থাকে, তা মেরামত করার চেষ্টা করে। ভুল করার সময় নিরাপদ থাকা জরুরি—তাদের ভুল করতে দিন, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে যেখানে আপনি পাশে থাকতে পারেন এবং সাহায্য করতে পারেন। এতে তারা নিজের ভুল থেকে শিখবে।
৮.কথা বলার জন্য উৎসাহ দেওয়া (Encouraging them to talk):
ইতিবাচক অভিভাবকত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুদের তাদের অনুভূতি নিয়ে মন খুলে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য উৎসাহিত করা। ভাল-মন্দ সব ধরনের অনুভূতি,কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে আবেগপ্রকাশ করতে তাদের পাশে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বাস্থ্যকরভাবে তাদের অনুভূতি মোকাবিলা করতে শিখতে পারে।
যখন আপনি তাদের দেখান যে, আপনি তাদের আবেগ নিয়ে কথা বলার জন্য সবসময় প্রস্তুত আছেন, তখন তারা নিরাপদ মনে করে নির্ভয়ে নিজের অনুভূতি শেয়ার করতে পারে এবং প্রয়োজনে আপনার কাছে আসে। এটি শেখায় যে তাদের অনুভূতি থাকা ঠিক আছে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য তারা কীভাবে সঠিকভাবে অনুভূতি গুলো প্রকাশ করতে পারে ও সেগুলোকে নিয়ে কাজ করতে পারে।
৯. সমস্যা সমাধান শেখাতে সাহায্য করা(Helping them learn problem solving):
শিশুদের সমস্যা সমাধান শেখানো তাদের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক যেমন তাদের ভুল করার সুযোগ দেওয়া। এটি শেখানোর কিছু উপায় রয়েছে, যা পরিস্থিতি এবং সন্তানের বয়স অনুযায়ী সমন্বয় করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি তারা ছোট হয় এবং কোনো কিছুর সঙ্গে সমস্যায় পড়ে, আপনি প্রথমে দেখাতে পারেন কীভাবে সেটি ঠিকভাবে সমাধান করা যায়, যেমন- তারা বড় হয়, যখন তারা আপনার সাহায্য চায়, তখন তাদের আগে নিজে সমস্যার সমাধান চিন্তা করতে দিন, তারপর প্রয়োজনমতো গাইড করুন। open-ended প্রশ্ন ব্যবহার করলে তারা নিজে থেকে সমাধান বের করার চেষ্টা করবে এবং সত্যিই সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শিখবে। তাদের সমস্যায় সাহায্য করা তাদের শেখায় যে সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব এবং সাহায্য চাওয়াও ঠিক আছে।
১০. ক্ষমা প্রদর্শন করা (Showing forgiveness):
ক্ষমা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই কখনও কখনও কঠিন অনুভূতি হতে পারে। তবে, ছোটবেলায় শিশুকে শেখানো গুরুত্বপূর্ণ যে তারা তাদের ভুল বা খারাপ আচরণের জন্য দায়িত্ব নিতে পারে, আর সেই ভুলের জন্য তাদের ক্ষমা করে দেওয়া যেতে পারে। এটি তাদের শেখায় যে, তাদের কাজ অন্যদের কেমন প্রভাব ফেলে এবং নিজেদের ভুলকে ক্ষমা করতে শিখতে সাহায্য করে। ক্ষমা দেখাতে পারেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার মাধ্যমে এবং বোঝাতে যে ভুলের পরও বাবা-মার কাছে তারা প্রিয় ও মূল্যবান। এটি আপনার ও শিশুর মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে এবং তাদের শেখায় যে, ক্ষমা একটি শক্তিশালী অনুভূতি, যা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতির মধ্যে ইতিবাচক অভিভাবকত্ব অনেক কার্যকরী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি। সুস্থ পরিবার গড়তে আসলে ইতিবাচক অভিভাবকত্বের কোন বিকল্প নেই।
References
Positive Parenting | UNICEF. (n.d.). Retrieved February 2, 2026, from https://www.unicef.org/cuba/en/positive-parenting
Do You Have an Authoritative Parenting Style? (n.d.). Verywell Mind. Retrieved February 2, 2026, from https://www.verywellmind.com/what-is-authoritative-parenting-2794956
Muraco, J. A., Ruiz, W., Laff, R., Thompson, R., & Lang, D. (2020). Baumrind’s Parenting Styles. https://iastate.pressbooks.pub/parentingfamilydiversity/chapter/chapter-1-2/
BeaconMM. (2022, May 20). What Are Tips for Positive Parenting? Dana Behavioral Health. https://www.danabehavioralhealth.org/positive-parenting-10-tips-for-raising-mentally-strong-kids/
