বিয়ে হচ্ছে একটি নতুন জীবনের সূচনা। এটি সাধারণত বিশ্বাস করা হয় যে বিবাহের বন্ধন একটি নিরাময় শক্তি হিসাবে কাজ করতে পারে, বিশেষত ওই ব্যক্তিদের জন্য যারা মানসিক স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াই করছেন। বিবাহ একজন ব্যক্তির সমস্ত সমস্যা বা রোগের সমাধান করতে পারে এই ধারণাটি সম্ভবত চিকিৎসা বিষয়ের পরিবর্তে সামাজিক বিশ্বাস এবং ভ্রান্তবিশ্বাসের মধ্যে নিহিত। বিবাহ মানসিক রোগের জন্য একটি জাদুকরী সমাধান নয়। ইতিহাস জুড়ে, বিবাহকে প্রায়শই বিভিন্ন ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের সমাধান বা সুখ এবং পরিপূর্ণতার পথ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। মানসিক রোগের সাথে মোকাবিলা করার জন্য কেবল একজন ব্যক্তির কাছে আশ্রয় এর চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন। প্রয়োজন একটি জটিল এবং বিস্তৃত পদ্ধতির। আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে বিয়ে দিলেই রোগ ভালো হয়ে যাবে, এজন্য অনেক সময় আমার আত্মীয়-স্বজনরা মনে করে মানসিক রোগের লক্ষণগুলো বিয়ে করার বাহানা মাত্র। এই ধারণার জন্য অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া হয় না, অপেক্ষা করা হয় সঠিক বয়সের এবং যত দ্রুত সম্ভব তাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার লক্ষণ গুলি গোপন রেখে বিয়ে দেওয়া হয় ফলশ্রুতিতে মানসিক রোগের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিয়ের পরবর্তী জটিলতা এই রোগকে আরো প্রভাবিত করে এবং অনেকগুলো ক্ষেত্রে বিয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিবাহ দুর্বল মনের ব্যক্তিদের জন্য চাপের সৃষ্টি করতে পারে, যা মানসিক-স্বাস্থ্য সমস্যার বিকাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিয়ে যুবক বা বৃদ্ধদের জন্য সমানভাবে মানসিক চাপের সৃষ্টি করে (Uecker, 2012)। মানসিক রোগ বৈবাহিক কলহের কারণ হতে পারে। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে বৈবাহিক চাপ বিভিন্ন মানসিক রোগ ত্বরান্বিত করে (Nambi, 2005)।

বিয়েকে প্রায়ই ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু এই বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি বা প্রমান নেই (Srivastava, 2013)। কিছু ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য যেমন নির্ভরতা, নিষ্ক্রিয়তা, আগ্রাসন, হিস্ট্রিওনিক্স, প্যারানিয়া এবং আবেশ, বিশেষ করে যখন একজন ব্যক্তির পক্ষে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়, গুরুতর দাম্পত্য কলহের দিকে নিয়ে যেতে পারে। (Suchles et al., 1977)। মানসিক রোগের উপস্থিতিতে বিয়ে হলে, মানসিক অবস্থার অবনতির প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এটি বিশেষ করে মহিলা সাইকোটিক রোগীদের ক্ষেত্রে সত্য। অসুস্থতা বৃদ্ধি/পুনরায় হওয়ার জন্য দায়ী হিসাবে বর্ণিত বিভিন্ন চাপের মধ্যে রয়েছে বিবাহের অনিশ্চয়তা,

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে মানসিক রোগীদের দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ এবং বিবাহবিচ্ছেদের হার বেশি (Dominian, 1979)। বিবাহ একটি সামাজিক প্রক্রিয়া যা সফল হওয়ার জন্য কিছু সামাজিক সক্ষমতার প্রয়োজন। সিজোফ্রেনিয়া, যা এই ধরনের সক্ষমতা হ্রাস করতে পারে, বৈবাহিক হার কম এবং প্রতিকূল বৈবাহিক ফলাফলের সম্ভাবনা বৃদ্ধির সাথে যুক্ত। জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে বিবাহ মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তবে এটি সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিকার হিসাবে কাজ করতে পারে না (Lim & Raymo, 2016)। বিবাহ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সুবিধা প্রদান করতে পারে, তবে এটি জাপানে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিরাময়ের জন্য সর্বজনীন সমাধান হিসাবে কাজ করতে পারে না।

এখন একটি প্রশ্ন থেকে যায়, মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কি বিয়ে করতে পারে?

প্রশ্নের উত্তর বিতর্কিত। ছোটখাটো মানসিক সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য উত্তরটি সহজ। তবুও, যাদের গুরুতর মানসিক সমস্যা রয়েছে তাদের সাথে কাজ করার সময় কয়েকটি জিনিস মনে রাখতে হবে। যেমন, অসুস্থতার ধরনটা কি, তা কতটা জটিল, এর ফলে রোগী শারীরিক ও মানসিকভাবে কতটা অক্ষম, রোগী স্বাবলম্বী কিনা, বিয়ের পর বৈবাহিক দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড সে পালন করতে পারবে কি না, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক কর্মকান্ড এবং বিবাহিত জীবনের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে কিনা।
বিবাহ তার নিজস্ব চ্যালেঞ্জ সহ একটি জটিল মানব সম্পর্ক। যদিও এটি ভালোবাসা এবং সমর্থনের উৎস হতে পারে, তবে এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে এটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য একটি নিশ্চিত সমাধান নয়।

কেন বিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান নয়:

● মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ব্যক্তিগত: মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা সাধারণত ব্যক্তির ভেতরের অনুভূতি, চিন্তা এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি শুধুমাত্র সম্পর্ক বা বিয়ের মাধ্যমে সমাধান হয় না।

● অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কের ঝুঁকি: একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক মানসিক চাপ ও উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।

● সামাজিক চাপ: বিবাহের মধ্যে সামাজিক প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করার চাপ অসহনীয় হতে পারে, যার ফলে অপর্যাপ্ততার অনুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়তে পারে।

● সঙগী ও পরিবারের সদস্যদের উপর নেতিবাচক প্রভাবঃ মানসিক রোগাক্রান্ত ব্যক্তিটির বিয়ের পরে তার মানসিক অস্বাভাবিকত্ব তার সঙগী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ককে বাধাগ্রস্থ করে এবং সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে করণীয়:

● পেশাদার সাহায্য: মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ধরন অনুযায়ী সাইকোথেরাপি, কাউন্সেলিং বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।

● ଔষধ সেবন: প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতে ଔষধ সেবন করা।

● স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং মেডিটেশন মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে।

● সম্পর্কের মান উন্নত করা: যেকোন সমস্যার ক্ষেত্রেই আপনজনদের সাথে পারষ্পরিক সম্পর্কের আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতা সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে সহায়ক

● পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থন: যে কোনো সমস্যায় পরিবার এবং বন্ধুদের সমর্থন মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। বরং মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া, সম্পর্কের গুণগত মান বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে পেশাদার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া জরুরি।

 

যে কোন সহায়তায় আমরা পাশেই আছি……..
অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ফোন করুন –
আমাদের ঠিকানা – “ ইনসাইট সাইকো সোশাল কেয়ার এন্ড রিসার্চ।
৭১, পাইওনিয়ার রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা।

References

Behere, P. B., Rao, S. T., & Verma, K. (2011). Effect of marriage on pre-existing psychoses. Indian journal of psychiatry, 53(4), 287-288.

Dominian, J. (1979). Marriage and psychiatric illness. British medical journal, 2(6194), 854.
Marriage and Family, 78(3), 780-796.

Nambi, S. (2005). Marriage, mental health and the Indian legislation. Indian journal of psychiatry, 47(1), 3-14.

Schless, A. P., Teichman, A., Mendels, J., & DiGiacomo, J. N. (1977). The role of stress as a precipitating factor of psychiatric illness. The British Journal of Psychiatry, 130(1), 19-22.

Srivastava, A. (2013). Marriage as a perceived panacea to mental illness in India: Reality check. Indian Journal of Psychiatry, 55, $239-$242.

Uecker, J. E. (2012). Marriage and mental health among young adults. Journal of health and social behavior, 53(1), 67-83.