“তুমি যা কিছু করো না কেন, তাতে আমাকে প্রমাণ করতে পারবে না যে তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো।”

— মুনতাহা ও আসিফের গল্প

মুনতাহা ও আসিফের ৩ বছরের দাম্পত্য জীবন। তারা দুজনই চাকুরিজীবি। শুরুতে তাদের সম্পর্ক ভালোই চলছিল কিন্তু ইদানীং আসিফ মুনতাহাকে অফিস থেকে ফেরার পর অতিরিক্ত নজরদারীতে রাখছে, অহেতুক সন্দেহ করছে। বারবার মুনতাহার ফোন চেক করছে- ভাবছে যে, মুনতাহা আসিফকে প্রতারিত করে অন্য কাউকে সময় দিচ্ছে। কেবল মাত্র  সন্দেহের উপর ভিত্তি করেই মুনতাহার মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আইডি গুলো চেক করতে থাকে, প্রতিদিনই ঝগড়া, কথা-কাটাকাটি চলতেই থাকে, এক পর্যায়ে আসিফ মুনতাহার গায়ে হাত তোলে।কোন ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিজেও যেতে চায় না, মুনতাহাকেও যেতে দেয় না। আর যদি কখনো যায়ও তাহলে পুরোটা সময়ই মুনতাহাকে চোখে চোখে রাখে, কারো সাথে কথাও বলে না। এভাবে দুইজনের পরিবারের সাথেও দূরত্ব তৈরী হয়ে যায়। আস্তে আস্তে আসিফ পরিবারের এবং ফ্রেন্ড সার্কেলের সবার সাথেই দূরত্ব তৈরী করে ফেলে। ঠিক মতো রাতে ঘুমাতেও পারে না, তার কর্মক্ষেত্রে ও কাজে মারাত্নক সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যায়। কারণ সে, নিজের অফিস বাদ দিয়ে প্রায়ই মুনতাহাকে ফলো করে তার অফিসে চলে যেতে থাকে। আর এদিকে মুনতাহা আসিফের এমন অস্বাভাবিক ব্যবহারে প্রচন্ড মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছিল দিন কে দিন। পরিবারের সাথেও দূরত্ব তৈরী হয়ে যাওয়ায় কাউকে বলতেও পারতো না। প্রায় ২ বছর এভাবে চলতে চলতে এক সময় আর নিতে না পেরে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবেই তাদের ৫ বছরের সংসারের ইতি ঘটে।

আমাদের চারপাশে এমন অনেক দম্পতি রয়েছে তারা একে অপরকে এভাবেই অস্বাভাবিক সন্দেহ করেই যাচ্ছে। যা তাদের প্রতিদিনের সম্পর্ককে দিনকে দিন অনেক জটিল করে তুলছে। কিন্তু তারা এটি বুঝতেই পারছে না যে এটা স্বাভাবিক নয়। যাকে আমরা মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলতে পারি pathological jealousy বা সঙ্গীর প্রতি অস্বাভাবিক সন্দেহপ্রবণতা।

প্যাথলজিক্যাল জেলাসি কি?

Pathological jealousy হলো একটি অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত সন্দেহের রূপ। সেই সাথে এটা চিন্তার এক ধরনের ত্রুটি যেখানে ব্যক্তির সঙ্গীর প্রতি অস্বাভাবিক অবিশ্বাস এবং আনুগত্য নিয়ে ভিত্তিহীন সন্দেহ চলতেই থাকে। এটি সাধারণত সম্পর্কের নিরাপত্তাহীনতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে ঘটে।

স্বাভাবিক সন্দেহ ও pathological বা অস্বাভাবিক সন্দেহর মাঝে পার্থক্য হচ্ছে স্বাভাবিক সন্দেহ বাস্তব প্রেক্ষাপট ও যুক্তির ভিত্তিতে ঘটে এবং প্রমাণ পেলে মিটে যায়, যেখানে pathological সন্দেহ অযৌক্তিক, দীর্ঘস্থায়ী, এবং মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি আসলে এমন একধরনের সমস্যা যেটা   নারী বা পুরুষ উভয়েরই হতে পারে।  যারই হোক না কেন, তার যে opposite partner বা সঙ্গী রয়েছে তাকে সন্দেহ করতে থাকেন। তিনি মনে করেন, তার যে পার্টনার বা সঙ্গী রয়েছে, সে তাকে প্রতারণা করছে বা তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্য কারো সাথে যৌণ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে – এই ধরনের সন্দেহ প্রতিনিয়তই তার মধ্যে কাজ করতে থাকে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এ সন্দেহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পুরোটাই অযৌক্তিক ও চিন্তার ত্রুটি।

ঠিক কি কারণে এটা হয় সে সম্পর্কে বলা কঠিন , কিন্তু সবেষণায় দেখা গেছে এই ধরনের সমস্যাটি যাদের হয় তাদের হয়তো অন্য কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা ছিল বা রয়েছে। যেমন: depression, schizophrenia, bipolar mood disorder, behavioral disorder অথবা কোনো ধরনের আসক্তি বা addiction এর সাথে যুক্ত।

Statistical study/গবেষণা:

  • গবেষণায় এসেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ২৮-৭৭ বছর বয়সের ব্যক্তিদের মাঝে এ সমস্যাটি বেশি দেখা যায়।
  • একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, তরুণ প্রাপ্ত বয়স্কের প্রায় ১০% তাদের সঙ্গীকে নিয়ে সন্দেহমূলক চিন্তা প্রদর্শন করেছে, যদিও তাদের মধ্যে অন্যান্য মানসিক ব্যাধির লক্ষণ দেখা যায় নি। (Marazziti et al., 2003)
  • অস্বাভাবিক সন্দেহপ্রবণতা উল্লেখযোগ্য  মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে এবং এটি সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে যার মধ্যে হত্যাকাণ্ড এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। (Almeida Leite et al., 2016)
  • অস্বাভাবিক প্রেমময় সন্দেহপ্রবণতার প্রকোপ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় .৫-১% ধারণা করা হয়। অস্বাভাবিক এই হিংসা বা সন্দেহপ্রবণতা পুরুষ ও মহিলা উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তবে একটি গবেষণায় পুরুষরা বেশি আক্রান্ত পাওয়া গিয়েছে। (Soyka & Schmidt, 2011)।
  • তবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রকোপ বেশি। এটি সাধারণত আত্মমর্যাদাহীনতা এবং রোমান্টিক সঙ্গীর প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সাথে যুক্ত।( Seeman, 2016)

প্রাত্যহিক জীবনে প্যাথলজিকাল জেলাসির প্রভাব-

প্যাথলজিকাল জেলাসি একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, যার ফলে তাদের ব্যক্তিগত, পেশাগত, সামাজিক, পারিবারিক এবং আধ্যাত্বিক জীবন বিপর্যস্ত হতে পারে। এর ফলে আচরণগত যে সমস্যাগুলো সুস্থ সুষম জীবনে বাধা সৃষ্টি করে, সেগুলো হলো-

প্রথমত, পারষ্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব-

  • বিশ্বাসের অবনতি- সঙ্গীর প্রতি অতিরিক্ত সন্দেহ সম্পর্কের ভাঙ্গন সৃষ্টি করতে পারে
  • আবেগীয় চাপ
  • একাকীত্ব
  • বিচ্ছেদ বা বিবাহ বিচ্ছেদ- সম্পর্কের ধ্বংসাত্নক ফলাফল হতে পারে

দ্বিতিয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব-

  • উদ্বেগ এবং অতিরিক্ত সন্দেহ প্রবণতা
  • বিষন্নতা

তৃতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে প্রভাব-

  • কাজে- কর্মে অমনোযোগী।
  • কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস।
  • সহকর্মীদের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কে সমস্যা।
  • পদাবণতি

চতুর্থত, সামাজিক জীবনে প্রভাব-

  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
  • বন্ধু এবং পরিবারের সাথে বিরোধ, কলহ, বিচ্ছেদ।
  • সহিংসতার ঝুকি, যেমন- খুন- খারাবি, যখম বা আত্নহত্যার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।
  • আইনি সমস্যা- সহিংস বা অপরাধমূলক আচরণের কারণে জটিল পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে।

পঞ্চমত, শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব-

  • নানা রকম শারীরিক জটিলতা যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ
  • ধূমপান ও মাদকের ব্যবহার।
  • অন্যান্য আসক্তি।

এই প্রভাব গুলো শুধু যে আক্রান্ত তারই উপর পড়ে এমন না, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গীর উপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এই সম্পর্কে একটি বাস্তব শুনি আমরা –

“আরিয়ান একজন ড্রাগ এডিক্টেড রোগী। দুই বছর সম্পর্কের পর তাদের বিয়ে হয় এবং বিয়ের পর থেকে স্ত্রীর সন্দেহ হতে থাকে যে, আরিয়ান তার প্রতি বিশ্বস্ত নয়। ব্যবসায় বিষয়ক   তার ফোনে যখন পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের ফোন আসে, তখন তার স্ত্রী ওই মহিলাদের ফোন গুলো নিয়ে তার প্রতি সন্দেহ করা শুরু করতে থাকে এবং ঝগড়া করতে থাকে। এভাবেই শুরু হয় তাদের পারিবারিক অশান্তি এবং দীর্ঘসময় এভাবেই চলার পর তাদের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।

দীর্ঘ ১০ বছর পর অবনতির চরম পর্যায়ে আরিয়ান সিদ্ধান্ত নেয় যে , তারা ডিভোর্স নিবে। ডিভোর্স নেওয়ার পরে সে মানসিক ভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার  ব্যবসায়েও ব্যাপক ক্ষতি হয়, এক সময় সে চরম হতাশায় পড়ে ধীরে ধীরে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে ও এক সময় পুরোপুরি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। অবস্থার ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটলে পরবর্তীতে তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এবং তখন সে জানতে পারে যে , pathological jealousy বলতে একটি রোগ আছে। তার বক্তব্য মতে, সে যদি এই রোগটা সম্পর্কে আগে থেকে জানত তাহলে সে তার স্ত্রীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারতো এবং তার সুস্থ জীবনটা ও সংসার টা এভাবে নষ্ট হতো না।”

এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে কত সংসার ভাঙ্গছে, খুন খারাবি হচ্ছে, আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে তা কে জানে? তবে অজ্ঞতা বশতঃ এই বিষয়টি শুধু পরকীয়ায় ফেলে দেয়া হয়।তাই সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, সামাজিক সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর  দৃষ্টি আকর্ষন করছি। এই বিষয়টি আসলে খতিয়ে দেখা দরকার, শুধু এক তরফা দোষ না দিয়ে, আদৌ ঘটনার পেছনের ঘটনাটা কি আসলে, নাকি তারা প্যাথলজিকাল জেলাসিতে আক্রান্ত। তাহলে হয়তো অনেক সংসার বেচে যাবে, বেচে যাবে অনেক জীবন, সামাজিক বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে দূরীভূত হবে। এছাড়াও এ রোগের ব্যাপ্তি এবং আক্রান্তের হার সম্পর্কে গবেষনা অপ্রতুল। রোগটির ক্ষতিকারক লক্ষণ শনাক্ত এবং প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট লিখালিখি এবং প্রচারণা প্রয়োজন।

যে কেনো মানসিক সহায়তায় আমরা পাশেই আছি –

অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ফোন করুন –

আমাদের ঠিকানা – “ ইনসাইট সাইকো সোশাল কেয়ার এন্ড রিসার্চ”।

৭১,পাইওনিয়ার রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা।

 

References

Oxford. (n.d.). Shorter-oxford-textbook-of-psychiatry-7th-edition. Retrieved August 11, 2025, from http://archive.org/details/shorter-oxford-textbook-of-psychiatry-7th-edition

Almeida Leite, R., Conde, E., Queirós Santos, T., Almeida, M., Azevedo Santos, T., & Mesquita Figueiredo, A. (2016). Obsessive Versus Delusional Jealousy: Destruction in a Form of Creation – A Review. European Psychiatry, 33(S1), S531–S531. https://doi.org/10.1016/j.eurpsy.2016.01.1966

Pathological Jealousy: An Interactive Condition: Psychiatry: Vol 79 , No 4—Get Access. (n.d.). Retrieved August 11, 2025, from https://www.tandfonline.com/doi/full/10.1080/00332747.2016.1175838

Soyka, M., & Schmidt, P. (2011). Prevalence of Delusional Jealousy in Psychiatric Disorders*. Journal of Forensic Sciences, 56(2), 450–452. https://doi.org/10.1111/j.1556-4029.2010.01664.x