আজকাল তরুণ প্রজন্মের মাঝে গাঁজার ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে চলেছে, এবং এই প্রবণতা আমাদের সমাজে একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যবহার এর আসলে শুরুটা কোথায়? কিভাবে একজন কিশোর বা তরুণ গাঁজার মতো একটি নেশাজাত দ্রব্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে? অনেক সময়ই এর শুরুটা হয় কৌতূহল থেকে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডার সময় সাময়িক আনন্দ পাবার জন্য।  বন্ধুবান্ধবদের কথায়, কিংবা “একবার ট্রাই করে দেখ, সবাই নেয়, গাজা নিলে পড়া ভালো মনে থাকে”  এই জাতীয় প্ররোচনায় পড়ে ।

এই প্রবণতা আরও তীব্র হয় যখন তরুণরা লক্ষ্য করে যে সমাজের একটি বড় অংশ গাঁজাকে একটি নিরাপদ ও তুলনামূলকভাবে ক্ষতিকরহীন নরম মাদক হিসেবে গ্রহণ করছে।বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন  কনটেন্টে গাঁজাকে ‘রিল্যাক্সিং’, ‘কুল’ বা ‘ক্রিয়েটিভিটি বাড়ায়’ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা তরুণ মস্তিষ্কে এক ধরনের ইতিবাচক ভাবনার জন্ম দেয়। অনেক সময় এর সঙ্গে যোগ হয় কারো কারো জীবনের হতাশা, একাকিত্ব, পারিবারিক কলহ বা মানসিক চাপে ভেঙে পড়া একটি মন,যাদের জীবনে স্থিরতা নেই, লক্ষ্য নেই, কিংবা নিজের কষ্টের কথা বলার বা বোঝার মতো কেউ নেই, তাদের কাছে গাঁজা হয়ে ওঠে বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তির একটি পথ।কিন্তু এক সময় এটি  ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বা খোলামেলা কোন আলোচনা না থাকায় তরুণরা অনেক সময় ভুল পথে চলে যায় না বুঝেই, না জেনেই। কারণ এটি আসক্তি তৈরী করে না,এটি এলকোহল বা হেরোইনের মতো শারীরিক প্রত্যাহার লক্ষণ তৈরী করে না। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা- বিশেষজ্ঞদের মতে গাঁজা এখন আর আগের সেই নিরীহ গাছ নয়, এটি রসায়ন চক্রে রূপ নিয়েছে এক ধরনের “তরল মাদকে”, যা তরুণ তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যে বিপদজনক প্রভাব ফেলছে ।

অথচ তারা জানেই না যে গাঁজা শুধু সাময়িক স্বস্তি বা আনন্দ নয়, বরং গাঁজা নির্ভরতা (Cannabis Use Disorder) এখন একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। গাঁজা হয়তো সব সময় অ্যালকোহলের মতো যকৃত নষ্ট করে না বা সিগারেটের মতো ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করে না, কিন্তু তাতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ও বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই ধোঁয়া দীর্ঘক্ষণ ফুসফুসে ধরে রাখে, যা আরও ক্ষতিকর।

 

গাঁজা ও মানসিক বিভ্রান্তি (Psychotic Features Linked to Marijuana)

গাঁজা সেবনের ফলে সাইকোটিক (psychotic) বা মানসিক বিভ্রান্তিজনিত কিছু প্রভাব দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যখন কেউ অতিরিক্ত পরিমাণে বা নিয়মিত সেবন করে। Psychosis উপসর্গগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলা। এই ধরণের প্রভাবগুলো সাধারণত অস্থায়ী হলেও, কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী মানসিক রোগের রূপও নিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে আগে থেকে এই ধরনের মানসিক রোগের ইতিহাস আছে, তাঁদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। ঘন ঘন বা অনেক বেশি গাঁজা সেবন করলে মনে রাখা, শেখা, মনোযোগ দেওয়া, দ্রুত কিছু বোঝা বা কাজ করা, চলাফেরা ও কথা বলার ক্ষমতায় সমস্যা হতে পারে। তাই গাঁজা সেবন শুধু সাময়িক মজা নয়, এতে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে।

 

মস্তিষ্কে গাঁজা ব্যবহারের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

তরুণ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সাম্প্রতিক গাঁজা ব্যবহারের ফলে (গ্রহণের ২৪ ঘন্টার মধ্যে) চিন্তাভাবনা, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, সমন্বয়, নড়াচড়া এবং সময় উপলব্ধির উপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। গাঁজা সেবন তরুণদের মাঝে পড়াশোনায় খারাপ ফলাফল এবং স্মৃতিজনিত সমস্যা তৈরীর সম্ভাবনা সৃষ্টি করে (CDC, 2024)।বিকাশমান বয়সে, যেমন শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে, মস্তিষ্ক পূর্ণরূপে পরিপক্ব না হওয়ায় গাঁজা ও এর প্রধান উপাদান THC-এর ক্ষতিকর প্রভাবের দ্বারা আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কারণ মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় 25 বছর বয়স পর্যন্ত বিকাশ অব্যাহত থাকে। ১৮ বছরের আগে গাঁজা ব্যবহারে মস্তিষ্কের মনোযোগ, স্মৃতি ও শেখার জন্য প্রয়োজনীয় স্নায়বিক সংযোগ প্রভাবিত হতে পারে। এসব প্রভাব দীর্ঘ সময় স্থায়ী থাকতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ীও হয়ে যেতে পারে। তবে এই প্রভাবগুলি সম্পূর্ণরূপে বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। (Source: Cannabis and Brain Health. Cannabis and Public Health, April 16, 2024)

 

মারিজুয়ানার বা গাঁজার সক্রিয় উপাদান THC

গাঁজার মূল সক্রিয় উপাদান হলো THC (Tetrahydrocannabinol), টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC) হলো গাঁজা গাছের (ক্যানাবিস) এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান, যা মূলত নেশার অনুভূতি তৈরি করে। গাঁজায় মোট ১১৩টির ও বেশি ধরনের উপাদান (ক্যানাবিনয়েড) আছে, তার মধ্যে THC সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং প্রভাবশালী। যা মস্তিষ্কের ডোপামিন উৎপাদনে প্রভাব ফেলে (Tetrahydrocannabinol,2025)।ডোপামিন হরমোন বেশি নিঃসরণ হলে সিজোফ্রেনিয়া বা সাইকোসিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। THC মূলত মস্তিষ্কের prefrontal cortex, hippocampus, ও striatum অংশে কার্যকর হয়, যেগুলো চিন্তা, স্মৃতি, এবং আবেগনিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

গাঁজার কারণে সাইকোটিক লক্ষণ কীভাবে দেখা দিতে পারে?

যেহেতু গাঁজার সক্রিয় উপাদান THC মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে,যার ফলে ডোপামিন নিঃসরণের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।এই ভারসাম্যহীনতার ফলে সিজোফ্রেনিয়া, পারানয়েড ধারণা এবং সাইকোসিসের মতো মানসিক বিকৃতির সৃষ্টি করতে পারে।

এর ফলে দেখা দিতে পারে:

  • হ্যালুসিনেশন: এমন কিছু দেখা বা শোনা, যা বাস্তবে নেই।
  • ভ্রান্ত ধারণা (Delusions): যেমন “সবাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে”।
  • বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা (Disconnection from Reality)
  • চিন্তা-ভাবনায় গোলমাল।
  • অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা বা সন্দেহভিত্তিক হিংসা।
  • অসংগঠিত ও এলোমেলো কথা বলা ।
  • পরিবার, বন্ধু, কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
  • নিজের সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা কিংবা অন্যদের প্রতি সন্দেহপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া।

কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের হার

কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ১৫–১৬ বছর বয়সী কিশোরদের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের হার ৫.৫ শতাংশ, যা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় (৪.৪ শতাংশ) বেশি। বিশেষ করে ওশেনিয়া ও ইউরোপ অঞ্চলে কিশোরদের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এসব অঞ্চলে কিশোরদের মধ্যে গাঁজা-নির্ভরতা (Cannabis Use Disorder) একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।(World Drug Report 2024, n.d.) গাঁজা অল্প সময়ের জন্য আরাম দিলেও বেশি বা দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও বিকাশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, যা মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করে।

গাঁজার বৈধতা ও বর্তমান পরিস্থিতি

গাঁজা বা মারিজুয়ানা এখনো অনেক জায়গায় অবৈধ হলেও, তবে “অবৈধ” শব্দটি আর বেশি দিন প্রযোজ্য নাও হতে পারে। ১৯৯৬ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২৩টি রাজ্য চিকিৎসা উদ্দেশ্যে গাঁজা বা মারিজুয়ানাকে বৈধ করেছে। আলাস্কা, কলোরাডো, ওরেগন, ওয়াশিংটন এবং ওয়াশিংটন ডিসি-তে ২১ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বিনোদনমূলক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে (Marijuana and the Developing Brain, n.d.). তবে এই আইনগুলো বিতর্কের বাইরে নয়। সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে বয়সসীমা থাকা সত্ত্বেও বৈধকরণে তরুণদের জন্য মারিজুয়ানা সহজলভ্য হয়ে যেতে পারে। আর কিশোরদের বিকাশমান মস্তিষ্ক এই মাদকের কারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

প্রতিরোধে করণীয়

গাঁজা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। পরিবারের সদস্যদের উচিত মাদক সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে যেন তারা সঠিক তথ্য জানতে পারে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত মাদক বিরোধী প্রচারণা এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালানো দরকার, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঠিক মনোভাব গড়ে তুলবে। পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীদের ইতিবাচক প্রভাব কাজে লাগিয়ে যুব সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে উৎসাহিত করতে হবে। গাঁজার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে প্রচার ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসাধারণকে সচেতন করাও জরুরি। এছাড়া, মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং সেবা সহজলভ্য করতে হবে যাতে যারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তারা সাহায্য পেতে পারে